পৃষ্ঠাসমূহ

সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১২

ক্ষমতার যুদ্ধ স্থগিত রাখুন

হঠাৎ করেই দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিএনপির গণমিছিল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে পুলিশের গুলিতে চারজন মারা গেছেন। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুল মান্নান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল

৩০ জানুয়ারি বিএনপির গণমিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেছে আওয়ামী লীগও। এটি যেমন আমাদের স্বস্তি দিয়েছে, তেমনি জোরালো করেছে কিছু প্রশ্নও। সত্যিই কি নাশকতার কোনো আশঙ্কা ছিল ২৯ জানুয়ারির কর্মসূচিতে, যদি ছিলই তাহলে ৩০ তারিখে কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে হলো গণমিছিল? আশঙ্কা যদি নাই ছিল তাহলে কেন পুলিশ হঠাৎ করে ২৯ জানুয়ারি গণমিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল চারটি বড় বিভাগীয় শহরে? আরও যা প্রশ্ন, কেনইবা একই ধরনের কর্মসূচি পালনে বাধা দিতে গিয়ে আগের দিন দেশের অন্যান্য অঞ্চলে গুলি বর্ষণ করল পুলিশ?
২৯ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে (চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে) প্রাণ হারিয়েছেন চারজন মানুষ, আহত হয়েছেন চার শতাধিক। তাঁরা বিএনপির কর্মী হতে পারেন, নাও হতে পারেন। মূল বিষয় হচ্ছে, পুলিশ এদিন গুলি চালিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বে গণমিছিলের মতো একটি গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনকালে। কর্মসূচি পালনকালে নাশকতা দূরে থাক, বড় ধরনের সহিংসতা হয়েছে, এমন কোনো খবরও ৩০ জানুয়ারির পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। সরকারের পুলিশ তাহলে মাত্রাতিরিক্ত মারমুখী আর নির্মম হয়ে উঠল কেন?
সরকারের এ আচরণ কিছুটা আকস্মিক, তবে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মাত্র পাঁচ দিন আগে মাহী বি. চৌধুরীর ব্লু ব্যান্ড কল নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের কর্মসূচি লাঠিপেটা করে পন্ড করে দেওয়া হয়। সিপিবিকে কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেওয়া হয়নি নির্ধারিত স্থানে। বিএনপির ক্ষেত্রে সরকারের কঠোরতা ছিল আরও খোলামেলা। কর্মসূচির আগের তিন-চার দিন সরকারের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত কিছু মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নানাভাবে জানিয়ে দেন বিএনপিকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ পূর্বঘোষিত বিএনপির গণমিছিলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয় ২৯ জানুয়ারি, পুলিশি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিএনপি চার বিভাগীয় শহরের গণমিছিল একদিন পিছিয়ে ৩০ জানুয়ারিতে নিয়ে গেলে সেদিনও প্রায় একই স্থান ও সময়ে আবারও কর্মসূচি ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। ২৯ তারিখে ঘটে গুলিবর্ষণের ঘটনা!
সার্বিকভাবে সরকারের আচরণ ছিল উসকানিমূলক ও দমনমূলক। এর আগে বিএনপির কিছু কর্মকাণ্ডেও উসকানি ছিল। ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের ডাক, ডিসেম্বরের কিছু কর্মসূচিতে সহিংসতা, খালেদা জিয়া কর্তৃক সেনাবাহিনীতে গুমের অভিযোগ এবং কিছু সেনাসদস্য কর্তৃক সেনা অভ্যুত্থানের অপচেষ্টা—এসব ঘটনা সরকারের জন্য অবশ্যই উদ্বেগজনক ছিল। কিন্তু সরকারকে মনে রাখতে হবে কোনো আশঙ্কা বা উদ্বেগ থাকলে এর প্রতিকারও আছে সরকারের কাছে। গোয়েন্দা, পুলিশ ও প্রশাসনের মাধ্যমে আশঙ্কামূলক তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং সে অনুসারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা, অধিকার ও সুযোগ সরকারের রয়েছে। জনগণের কাছে নাশকতা বা যড়যন্ত্রের কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পেশ না করে বিরোধী দলের এ ধরনের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার অধিকার সরকারের নেই। বিশেষ করে ২৯ জানুয়ারি পুলিশ যে নৃশংসতা দেখিয়েছে তা সমর্থন করার মতো কোনো পরিস্থিতি অকুস্থলগুলোতে ছিল না।
সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে ২৯ জানুয়ারির ঘটনায় সরকারের ভেতরের কোনো হঠকারী গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল কি না তা খুঁজে বের করা এবং এ ধরনের গোষ্ঠীর প্রাধান্য প্রতিহত করা। ২৯ জানুয়ারি পুলিশ কর্তৃক ডিসপ্রপোরশনেট (অ-সমানুপাতিক) শক্তিপ্রয়োগের যে ঘটনা ঘটেছে তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা।
সরকারের কাছে আবেদন থাকবে তারা কোনো কারণে অতিরিক্ত নার্ভাসনেসে ভুগছে কি না তা খতিয়ে দেখার। জানুয়ারির পর পুরো ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা থাকার কারণে বিএনপির তেমন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। ফলে ২৯ জানুয়ারি নির্বিঘ্নভাবে কর্মসূচি পালন করতে দিলেও বিএনপি তার শক্তি বা ব্যাপ্তি ফেব্রুয়ারিতে অব্যাহত রাখতে পারত না, সরকারের জন্য বড় কোনো সমস্যাও তৈরি করতে পারত না। ২৯ জানুয়ারি কর্মসূচি প্রতিহত করতে গিয়ে তাহলে সাধারণ মানুষকে হত্যার কলঙ্ক গ্রহণ করার কী প্রয়োজন ছিল সরকারের? মার্চে বিএনপির বড় কর্মসূচি আছে। এ রকম বৃহৎ কর্মসূচি আওয়ামী লীগও গত আমলে পালন করেছে, তাতে সরকারের পতন ঘটে যায়নি, এবারও ঘটবে এমন ভেবে ব্যতিব্যস্ত হওয়ার তেমন কোনো কারণ ঘটেনি।
সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের আসল বিরোধ ক্ষমতা নিয়ে। বিএনপি বদ্ধমূলভাবে বিশ্বাস করে যে আগামী সংসদ নির্বাচনে কারচুপি করার উদ্দেশ্য রয়েছে বলেই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় রাজি হচ্ছে না। একই বিশ্বাস থেকে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন করেছিল আওয়ামী লীগ। সেটি যদি যৌক্তিক হয়ে থাকে তাহলে নিয়মতান্ত্রিক পথে গণ-আন্দোলন করার এবং এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনে চাপ সৃষ্টির অধিকার বর্তমান বিরোধী দলগুলোরও রয়েছে। গণ-আন্দোলনের পাশাপাশি বা এর আড়ালে যদি কোনো যড়যন্ত্রের চেষ্টা করা হয় সেটি প্রতিহত করার বৈধতা অবশ্যই সরকারের রয়েছে। কিন্তু তাই বলে গণ-আন্দোলনের বিকাশকে শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করার কোনো অধিকার সরকারের নেই।
ভালো হয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতার আগাম যুদ্ধ স্থগিত রাখে। ভালো হয় যদি অন্তত আগামী শীত পর্যন্ত মামলা, হামলা ও ভয়ভীতির মাধ্যমে বিএনপিকে খর্ব ও দুর্বল করার চেষ্টা বন্ধ থাকে, সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আন্দোলনের চেষ্টাও স্থগিত থাকে। মোকাবিলাই যদি অনিবার্য হয়ে পড়ে তাহলে দুই দলের উচিত উপযুক্ত সময়ে জনসমর্থনের জোরে নিয়মতান্ত্রিক পথে তা করা। তবে তার আগে অবশ্যই তাদের কর্তব্য হলো সংসদ ও প্রয়োজনে সংসদের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার সর্বাত্মক চেষ্টা করা।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১২

পীর: বাহিনী ও কাহিনি

বিশ-পঁচিশ বছর আগেও পীরদের মহা প্রতাপ ছিল দেশে। অনেক রাজনীতিবিদ, জেনারেল ও ক্ষমতাশালী লোক যেতেন পীরদের কাছে। বাংলাদেশে এসে এমনকি বেনজির ভুট্টোও অখ্যাত এক পীর মজিবর রহমান চিশতির কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। সারা দেশে তুমুল আলোচিত ছিল এ ঘটনা।
প্রথম আলোর সাংবাদিক কবির হোসেন পীরের ছবি তুলে আরেক ধরনের আলোড়ন তুলেছেন এখন দেশে। এই ছবি মুন্সিগঞ্জের পীর ও তাঁর বাহিনীর ভণ্ডামি এবং নিষ্ঠুরতাকে উন্মোচন করেছে। বহু মানুষ সোচ্চার হয়েছে ভণ্ড পীরের উপযুক্ত শাস্তির দাবিতে। কেউ কেউ বিস্ময়ে হতবাকও হয়েছে। কিন্তু পীর-সংস্কৃতি নিয়ে আসলে বিস্ময়ের কিছু নেই। যুগ যুগ ধরে মানুষের অশিক্ষা, অসহায়ত্ব আর অন্ধবিশ্বাসকে পুঁজি করে বাংলাদেশে চলছে ভণ্ড পীরদের দৌরাত্ম্য। কবিরের সচিত্র প্রতিবেদন দেখে মনে পড়ে এ রকম বহু ঘটনা।

২.
আমাদের তরুণ বয়সে পীরেরা ছিলেন দুই ধরনের। রাজনৈতিক পীর আর ব্যবসায়ী পীর। রাজনৈতিক পীরেরাও ধর্মব্যবসা করতেন, কিন্তু তাঁদের মূল ক্ষমতার উৎস ছিল রাজনীতিবিদ আর ক্ষমতাধর মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তখনকার দিনে রাজনৈতিক পীরদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ছিলেন ফরিদপুর নিবাসী আটরশির পীর। এরশাদের কল্যাণে তিনি তখন তারকাখ্যাতি পেয়েছেন বাংলাদেশে। কিন্তু আটরশির পীর জনসমক্ষে আসতেন না। তিনি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিতেন না। এমনকি তখন এমন গুজবও ছিল যে তাঁর ছবি নাকি ক্যামেরার রিলেতে তোলাও যায় না।
আটরশির পীরের কাছে যাওয়ার ‘সৌভাগ্য’ হয়েছিল আমারও। সাংবাদিক পরিচয় লুকিয়ে রেখে রওনা দিয়েছিলাম একবার আটরশিতে। সেখানে সবাইকে জুতো খুলে খালি পায়ে থাকতে হয়। আমরাও তা-ই করি। রাতে দেখা হলো তাঁর ফিটফাট ছেলের সঙ্গে। তিনি জুতো পরেই দিব্যি ঘুরছেন সবখানে। বাম রাজনীতির সোনালি দিন তখন দেশে, শ্রেণীচেতনা ছিল আমাদের অনেকের মধ্যেও। আটরশির পীরের ছেলের চকচকে জুতোর দিকে চেয়ে তাই রাগে গা জ্বলতে থাকে। গোপনে আটরশির ছবি তোলার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ফিরে আসি ঢাকায়।
পীরদের সঙ্গে আমার মোলাকাত শেষ হয়ে যায়নি তাই বলে। ১৯৮৯ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় যোগ দিয়ে বহু রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ঘটে জীবনে। পীরদের সামনাসামনি হওয়া ছিল সে রকমই কিছু। বিচিত্রায় একবার সিদ্ধান্ত হলো, পরের প্রচ্ছদকাহিনি হবে ঢাকার পীরদের নিয়ে। লিখব আমি।
সেটি ১৯৯২ সালের কথা। দেশে কিছুদিন আগে গণতন্ত্র এসেছে। গণতন্ত্র এসেছে পীর-ব্যবসাতেও। সারা ঢাকা তাই ছেয়ে গেছে পীরদের আস্তানায়। এঁদের অনেকের বিজ্ঞাপন ছাপা হতো তখন বহুল প্রচারিত দৈনিক আর সাপ্তাহিকগুলোতে। অনেক বিজ্ঞাপনে লেখা থাকত ‘চেহারা দেখে সমস্যার সমাধান দেয়া হয়’। কেউ করতেন সাপ দিয়ে চিকিৎসা, কেউ পাথর দিয়ে। কিন্তু সবারই দাবি, তাঁদের ক্ষমতা অলৌকিক কিংবা কুদরতি। আসলে তা কী, সেই বর্ণনা দেওয়ার জন্য একটু নিজের প্রতিবেদনের কথা বলে নিই।

৩.
ঢাকার অধিকাংশ পীর তখন একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে লোক ঠকাতেন। অতিথিকক্ষে তাঁদেরই বেতনভোগী কর্মচারীরা পীরের দর্শনার্থী সেজে থাকতেন। সমস্যায় আক্রান্ত কোনো মানুষ পীরের কাছে গেলে এই কর্মচারী বাহিনীর কেউ তাঁর সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিতেন। ওই ব্যক্তি হয়তো বলেন, তাঁর ব্যবসায় খুব দুর্দিন যাচ্ছে, পীরের কাছে এসেছেন তদবির করতে। পীরের কাছে তাঁর ডাক পড়ে হয়তো ঘণ্টাখানেক পর। পীর তাঁকে দেখে বলে দেন ‘তোমার তো ব্যবসার অবস্থা খারাপ, তাই না।’ ওই ব্যক্তি তখন চমকে উঠে ভাবেন, এই পীর আমাকে দেখেই বলে দিলেন সমস্যার কথা। এত মহা আল্লাহওয়ালা লোক! এ সুযোগে পীর তাঁকে নানা কথা বলে আরও ভড়কে দেন, দোয়া-তদবির-সদকা বিভিন্ন নামে তাঁর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন। প্রবীর মিত্রের অলৌকিক নয়, লৌকিক নামক বিখ্যাত গ্রন্থে ভণ্ড পীরদের এ রকম বহু টেকনিকের বর্ণনা আছে।
১৯৯২ সালে ঢাকার কয়েকজন বিখ্যাত পীরের ওপর প্রতিবেদন রচনার সময় প্রবীর মিত্রের বই আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। এই পীরদের একজন ছিলেন ‘হুজুর হজরত ফকির আবদুর রব চিশতী ছুম্মায়ে আজমিরী’। ছুম্মায়ে আজমিরীর চেম্বারে দর্শনার্থীদের ঘরে বসামাত্র মলিন চেহারার এক লোক এসে আলাপ জুড়ে দেন আমার সঙ্গে। তাঁর নাকি দুই বউ ছিল, দুজনই ‘মইরা শেষ’। তৃতীয় বিয়ের আগে তদবির করতে চান। আমার সমস্যা কী তা তিনি জানতে চান। আমি বানিয়ে বলি সমস্যার কথা। আমার বউ বড়ই বদ, তার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি, মামলা-মোকদ্দমা চলছে (আসলে আমি তখনো অবিবাহিত, মামলার কোনো ঝামেলাও ছিল না তখন)।
একটু পরেই হুজুরের দরবারে ডাক। তিনি উঁচু তাকিয়ার পাগড়ি মাথায় বসে। আতর, গোলাপজল, আগরবাতিতে আচ্ছন্ন ঘরের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসি আমি। কালো ব্যাগে গোপনে রেকর্ড হয় হুজুরের সঙ্গে আমার সংলাপ। সেখানকার কিছু অংশ ছিল হুবহু এ রকম:
‘হুজুর বলেন...তুমি এখন বড় টেনশনে আছো নিজেকে নিয়ে...তুমি বড়...অহেতুক মামলা-মোকাদ্দমা তোমার পেছনে লেগে থাকবেই, কিছু করতে পারুক আর না পারুক...তোমার বুকে একটা তিল আছে, আছে না?
জি না হুজুর (আসলেই আমার বুকে কোনো তিল নেই)।
আছে, অবশ্যই আছে, দেখি শার্ট খোলো...হুজুর আমার বুকের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, কি নাই?
জি না হুজুর।
আছেই, ভালো করে খেয়াল করে দেখো, গোসলের সময় কাঁচা হলুদ দিয়া ডইলা উঠায় ফেলবা।
হুজুর আমার সমস্যার কথা বলেন...
তোমার প্রথম জীবনে চাকরি হবে, তারপর ব্যবসা, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট, একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণ আছে, অস্ট্রেলিয়া-জাপান-সৌদি আরব...“ইয়ার লাইন” বোঝো?
জি হুজুর!
ইয়ার লাইনে তোমার বিমান দুর্ঘটনা শতকরা ৮৮ ভাগ, মাত্র ৮ ভাগ ভালো আছে...
বাকি ৪ ভাগ কী হুজুর?
যা বলি শোনো, তুমি বড় বেশি কথা বলো।’
(তথ্যসূত্র: আসিফ নজরুলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিদ্যাপ্রকাশ, ১৯৯৭)
ছুম্মায়ে আজমিরী ও অন্য পীরদের কাছে আমি কিছুদিন পর যাই প্রতিবেদক হিসেবে। এই পর্যায়ে তাঁদের কথাবার্তা একদম বদলে যায়। স্বীকার করেন যে আসলে সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারেন না তাঁরা। সমাধান আল্লাহর হাতে, তাঁরা শুধু দোয়া করে দেন। তাঁদের কাছে না এসে লোকজন নিজেরা দোয়া করলেই পারে।
বিজ্ঞাপনে তাঁদের দাবি আবার একবারে ভিন্ন। বিচিত্রায় আমার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে এসব অসংগতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন বের হওয়ার আগেই আল-জহুরী সর্পরাজ এ আর গনি তাঁর বিরুদ্ধে কিছু লেখা হলে সর্প দংশন করিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেন, প্রতিবেদন বের হওয়ার পর ছুম্মায়ে আজমিরী খোদার গজবের ভয় দেখিয়ে চিঠি পাঠান। মওলানা এম ইউ আজাদী কুদরতী বিচিত্রায় ফোন করে আমাকে বলেন, ‘আপনি একটা “ইসটুপিড” লোক।’
বিচিত্রায় প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার দুই বছর পর আমি বিদেশে যাই গবেষণার কাজে। ফিরে আসি পাঁচ বছর পর। তখনো দেশের নামকরা দৈনিকগুলোতে ছুম্মায়ে আজমিরীর বিজ্ঞাপন, আরও বহু নারী-পুরুষ পীরের বিজ্ঞাপন। আমাদের লেখালেখিতে কিছুই হয়নি তাঁদের।
কবির হোসেনের প্রতিবেদনের পর মুন্সিগঞ্জের পীর আমজাদ ধরা পড়েছেন, তাঁর সিন্ডিকেটের সদস্যরা ধরা পড়েছেন। কিন্তু তাঁদের কি শাস্তি হবে শেষ পর্যন্ত? পুলিশ কি ঠিকমতো তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করবে? সরকারের উকিল কি লড়বেন ঠিকমতো? আদালত কি জামিন না দিয়ে বিচার করবেন দ্রুত?
সব যদি ঠিকমতো হয়, একজন ভণ্ড পীর ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা হয়তো সাজা পাবে। কিন্তু বাংলাদেশ কি রেহাই পাবে এই পীরদের দৌরাত্ম্য থেকে? সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আমজাদের হাত থেকে কি রক্ষা পাবে অগণিত অসহায় মানুষ? আমার তা মনে হয় না।

৪.
ভণ্ড পীর আসলে শুধু মুন্সিগঞ্জের আমজাদেরা নন। মূল সমস্যা হলো, সমাজে এ রকম ভণ্ড পীর ছড়িয়ে আছেন সর্বত্র। মানুষের বিশ্বাস ও আনুগত্যকে পুঁজি করে এঁরা তাদের ঠকান নানাভাবে। নিজেরা হন অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতার মালিক। সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবী—সবার নেতৃত্বে আছেন এ রকম নেতাবেশী পীর। সবাই এমন নন, তবে অন্তত কেউ কেউ এমন। পীরদের মতো তাঁদেরও আছে উচ্ছিষ্টভোগী বাহিনী।
ভণ্ড পীরের মতো আচরণ করেন এমনকি আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারাও। দেশের সমস্যা, সমাজের সমস্যা ক্ষমতায় এসে অলৌকিক সমাধানের বাণী দেন। আমরা চরম ভক্তিবাদ দেখিয়ে, তাঁদের অন্ধভাবে বিশ্বাস করে ক্ষমতায় বসাই। পীরেরা ঝাড়ফুঁক দিয়ে, পানি পড়া খাইয়ে সমস্যার সমাধান করেন। সেই সমাধানে সমস্যা আরও বাড়তে থাকে। আমাদের রাজনীতিবিদেরাও গলাবাজি করে ডিজিটাল বাংলাদেশ কিংবা জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশের পানি পড়া খাইয়ে দেন আমাদের। তাঁদের ধোঁকা আর দুঃশাসনে শুধু বাড়তে থাকে দেশের সমস্যা। আরও মানুষ দরিদ্র হয়, আরও মানুষের ঘরের বাতি নিভে যায়, আরও মানুষ বস্তি কিংবা ফুটপাতে নেমে আসে।
পীরেরা পিটিয়ে অসুখ সারান। নেতারা পিটিয়ে প্রতিবাদের অসুখ সারান। পীরেরা কলা-মুলো ভ্যাট পান, নগদ টাকায় গড়ে তোলেন পাকা দালানকোঠা। নেতারা পান লাইসেন্স-পারমিট-কমিশন, বারিধারার প্লট। কোনো পীর দরিদ্র নন, কোনো নেতাও নন। পীরের আশপাশে গড়ে ওঠে মধুলোভী সঙ্গীদের বাহিনী। নেতাদের চারপাশেও তাই। পীরেরা কখনো কখনো গ্রেপ্তার হন, কালেভদ্রে শাস্তি পান। আমাদের নেতারাও তাই।
পীরের সঙ্গে নেতার মিল সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। এই মিল ঘোচানোই সবচেয়ে জরুরি।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
 তারিখ: ২৪-০৪-২০১০

দমননীতি: প্রতিবাদ থেমে থাকে না

বাংলাদেশের কিছু মানুষের মধ্যে বেশি কথা বলার রোগ আছে। এই রোগ সবচেয়ে বেশি রাজনীতিবিদদের মধ্যে। মন্ত্রিত্ব পেলে তাঁদের অনেকের কথা অসংলগ্নও হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সরকারের আমলে কিছু কিছু মন্ত্রী পিলে চমকানো বা হাস্যকর বক্তব্য দেওয়ার জন্যও ‘প্রসিদ্ধি’ অর্জন করেছেন। কারও কারও বক্তব্যে হাস্যরস আর বিরক্তি ছাপিয়ে ওঠে দুর্ভাবনা। মন্ত্রী হলে কি দেশের মানুষকে বোকা ভাবার বা বোকা বানানোর রোগ জন্মে অনেকের মধ্যে?
আমার ধারণা, তা-ই হয়। না হলে আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এই ইংগিত দেন কী করে যে বিরোধী দলের মানববন্ধন কর্মসূচিও ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য? ৭ জুলাই এক ঘণ্টার এই নিরীহ কর্মসূচিকে নস্যাৎ করার জন্য পুলিশ পিটিয়েছে কিংবা ছত্রভঙ্গ করেছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের। অতীতে মানববন্ধনের ওপর এ রকম চড়াও হওয়ার নজির সম্ভবত দেশে নেই। ‘দিনবদল’ এখানেও হচ্ছে বুঝলাম। কিন্তু মানববন্ধন কর্মসূচির সঙ্গে মন্ত্রীর দাবিমতো যুদ্ধাপরাধী বিচার নস্যাৎ করার সম্পর্ক কোথায়, এটা তো বোঝা যাচ্ছে না!
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে সরকারের লাভ হয়েছে। অন্য কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই একটি কারণে দেশের অনেক মানুষের সমর্থন এখনো পাচ্ছে তারা। কিন্তু এই মহান দায়িত্ব পালনের অজুহাতে অন্য সব ক্ষেত্রে জবাবদিহির বাইরে থাকার যে চেষ্টা সরকারের মন্ত্রীরা বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে চালাচ্ছেন, তা হাস্যকর। একই সঙ্গে অগ্রহণযোগ্য।

২.
বিএনপির সামপ্রতিক হরতালের বিরোধিতা করতে গিয়েও কোনো কোনো মন্ত্রী হরতালকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিএনপি যেসব দাবিতে হরতাল ডেকেছিল, তার মধ্যে যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রসঙ্গের কোনো উল্লেখই ছিল না। হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল পানি-বিদ্যুৎ সমস্যা, বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন, বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নানা ইস্যুতে। অতীতে প্রায় অবিকল এসব ইস্যুতে আওয়ামী লীগ বহুবার হরতাল পালন করেছে। হরতালের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোনো সম্পর্ক আগে না থাকলে এখন থাকবে কোন যুক্তিতে?
হরতাল প্রতিবাদের ভাষা বা কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে হরতালের আগের রাত থেকে শুরু করে হরতালের দিন জনগণকে এটি পালনে বাধ্য করার জন্য যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়, তা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। হরতালের সমালোচনা হওয়া উচিত মূলত এ কারণে। এ ছাড়া হরতালের আরও সমালোচনার জায়গা রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময় বলেছি, সরকারের যেসব ব্যর্থতার প্রতিবাদে বিএনপি হরতাল ডেকেছিল, সরকারের থাকার সময় তারাও একইভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। বিদ্যুতের ইস্যুতে সরকারের সমালোচনার আগে বিএনপিকে তাই এই খাতে তার নিজের অতীত ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে তারা কী কী কর্মসূচি নিয়ে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করবে, তার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। সন্ত্রাস, দলীয়করণ, দুর্নীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এসব বিষয়ে সংসদে বলার পর্যাপ্ত চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেই কেবল শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল কর্মসূচি দেওয়া উচিত।
সরকারের মন্ত্রীরা এ ধরনের যৌক্তিক কথা বলে হরতালের সমালোচনা করলে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু সরকার অব্যাহতভাবে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিরোধী দলের নেতাদের ‘গুম’ করে ফেললে, সীমাহীন দলীয়করণ চালালে বা সংসদে কথা বলতে না দিলেও হরতাল করা যাবে না, এটি ঠিক নয়। ঠিক নয় এসবের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুকে অযৌক্তিকভাবে সম্পর্কিত করা। হরতালের তুলনায় মানববন্ধন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতে বাধা দিলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আর কি পথ খোলা থাকবে?

৩.
বিএনপির মানববন্ধন কর্মসূচি ছিল হরতালের দিন গ্রেপ্তার করা তাদের তিন নেতার মুক্তির দাবিতে। আমাদের প্রশ্ন, মীর্জা আব্বাস, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা শমশের মবিন চৌধুরী এবং স্বাধীনতাযুদ্ধকালে শিশুবয়সী শহীদ উদ্দীন এ্যানী কি যুদ্ধাপরাধী? তাঁদের মুক্তির দাবির সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে নস্যাৎ করার সম্পর্ক কোথায়? এই দাবিতে কর্মসূচি দিলে সরকারকে এমনভাবে চড়াও হতে হবে কেন?
মানববন্ধন কর্মসূচি দিয়েছিল জামায়াতও। জামায়াতের মানববন্ধনের দাবি ছিল তাদের দলের তিন নেতার (নিজামী, মুজাহিদ ও সাঈদী) মুক্তির দাবিতে। তাঁদের সরকার যুদ্ধাপরাধের জন্য গ্রেপ্তার করেনি। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ১৯৭৩ সালের আইন অনুসারে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হলে এবং তখন জামায়াত এর প্রতিবাদে কোনো কর্মসূচি দিলে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা অবশ্যই সরকার করতে পারে। তার আগ পর্যন্ত তিন নেতার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রোধ করার কর্মসূচি হিসেবে আখ্যায়িত করার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। অপশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অধিকার তখন জামায়াতের থাকলে এখনো তা আছে। তবে এই আন্দোলনকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নস্যাৎ করার দিকে ধাবিত করার অধিকার জামায়াত, বিএনপি বা অন্য কারও নেই। দেশের একটি প্রচলিত আইনে এই বিচার করা হচ্ছে। এই বিচারের বিরোধিতা শুধু নৈতিকভাবে নয়, আইনগতভাবেও তাই অবৈধ। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে বলে এই সরকারের দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা দমননীতির বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি দেওয়া যাবে না, এটা বলাও অনুচিত ও অযৌক্তিক।
আমরা মনে করি, আগের বিএনপির সরকারের তুলনায় দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় সাফল্য দেখাতে পারলেই বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পরিবেশ আরও সুশক্ত হবে। এটি করা গেলে সরকরের জনসমর্থন বহু গুণে বাড়বে। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধপক্ষ একে নস্যাৎ করার কোনো কর্মসূচি দিতে ভয় পাবে, দিলেও আদৌ সফল হবে না। আওয়ামী লীগের সরকারকে বুঝতে হবে দলীয়করণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বা নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে জনসমর্থন হারালে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে দুর্নাম কুড়ালে সরকার পতনের যে পরিবেশ সৃষ্টি হবে, তাতেই বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হবে।

৪.
আওয়ামী লীগের সরকার দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতা ঢাকতে যুদ্ধাপরাধের বিচার বা জামায়াত ইস্যুকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে আরও বহুভাবে। আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের অসন্তোষ ও অভিযোগের একটি বড় কারণ ছাত্রলীগের অব্যাহত নৈরাজ্যকর এবং কখনো কখনো পাশবিক সন্ত্রাস। দেশে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এতে যে বীতশ্রদ্ধ তার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার পরও এ সমস্যার কোনো সমাধান সরকার করতে পারেনি কেন?
সরকারের মন্ত্রীদের একটি তৈরি উত্তর আছে এই প্রশ্নের। তাঁদের বক্তব্য, ছাত্রলীগের ভেতর শিবির ঢুকে গেছে, তারাই অনেক ক্ষেত্রে এসব সন্ত্রাস করছে। আমরা বুঝতে অক্ষম আওয়ামী লীগের অভিভাবকত্বে থাকা এই সংগঠনে শিবির ঢোকে কীভাবে, কারা এ জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কেন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
প্রশ্ন আরও আছে। ঢাকা বা অন্য কোথাও ছাত্রলীগের হাতে খুন-জখম হলে কেন গ্রেপ্তার করা হয় শুধু গুটিকয়েক মাঠপর্যায়ের কর্মীকে? দেশের সব পত্রপত্রিকায় জাহাঙ্গীরনগরের পাশবিক সন্ত্রাসের ঘটনায় সেখানকার ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়ী করা হলেও তাঁদের দুজনকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো না? শমশের মবিন চৌধুরী গাড়ি পুড়িয়েছেন, এহসানুল হক মিলন হাতঘড়ি ছিনতাই করেছেন এমন অদ্ভুত অভিযোগে তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া গেলে হত্যা, সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজির পর ছাত্রলীগের আসল হোতাদের কেন রিমান্ডে নেওয়া হয় না?
আমার খবর পাই, গোটা দেশের পুলিশ প্রশাসন ছাত্রলীগের সন্ত্রাস দমনে অনীহ থাকে অন্য একটি কারণে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার ছাত্রলীগ বা এর নেতাদের আশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের কোনো পদক্ষেপ নিলেই তাকে ‘জামায়াত-শিবিরের লোক’ হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয় ছাত্রলীগ এমনকি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের তাই গ্রেপ্তার করা হয় কেবল ব্যাপক সন্ত্রাস সংঘটিত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ পেলে। এর আগ পর্যন্ত এমনকি সংঘর্ষ চলাকালেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তারের সাহস পায় না। হরতাল চলাকালে বিরোধী দলের ওপর পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইন অনুসারে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করলে তাকে জামায়াত-শিবিরের লোক বলে অপদস্থ করা হবে না এই গ্যারান্টি কেউ কি দিতে পারবে?
এই গ্যারান্টি সরকারকেই দিতে হবে। বাছবিচার না করে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের সুস্পষ্ট ও আন্তরিক নির্দেশ পুলিশের ওপর না থাকলে, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালন করলে জামায়াত-শিবির অপবাদ পেতে হবে, এই আশঙ্কায় পুলিশ গুটিয়ে থাকলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের কোনো দিনও দমন করা যাবে না, এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির আগের সুনামও ফিরিয়ে আনা যাবে না।

৫.
সরকারকে আরেকটি জিনিস বুঝতে হবে। জামায়াত-শিবির অপবাদে চাকরি হারানোর ভয়ে পুলিশ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিস্ক্রিয় থাকতে পারে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধাদানের অপবাদ পেতে হতে পারে এই ভয়ে দেশের বিরোধী দলগুলো সরকারের কোনো ব্যর্থতার প্রতিবাদ করবে না, কর্মসূচি দেবে না, এটা আশা করা ঠিক নয়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রকৃতই কোনো বাধা থাকলে বা এলে তার উপযুক্ত প্রতিকার অবশ্যই সরকারকে করতে হবে। কিন্তু সবকিছুকে যুদ্ধাপরাধী বিচারের বাধা হিসেবে দেখালে আসল বাধাকে বরং দূর করা সরকারের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে।
সরকারকে বুঝতে হবে, একটি ভালো কাজ করলে সাত খুন মাফ হয়ে যায় না। তেমনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করলেই সরকারের অন্য নানা ব্যর্থতা
ঘুচে যাবে না। এর প্রতিবাদও থেমে থাকবে না।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

টার্গেট যখন ড. ইউনূস

২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর ড. ইউনূসের বক্তৃতা শোনার জন্য ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভার একটি যুক্ত সভা হয়েছিল। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ড. ইউনূসকে সম্মানিত বন্ধু হিসেবে সম্বোধন করে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া একটি সত্যিকারের প্রিভিলেজ (বিশেষ সুযোগ) হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আবেগপূর্ণ বক্তৃতার একটি অংশে তিনি বলেছিলেন: ‘২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর কাছ থেকে আমাদের বহু কিছু শেখার আছে এবং আমি আবারও তাঁর কাজ এবং আমাদের মধ্যে তাঁর উপস্থিতিকে স্যালুট (অভিবাদন) জানাচ্ছি।’
ড. ইউনূসকে নিয়ে ঠিক এক বছর পর বাংলাদেশের কয়েকটি দৈনিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সংবাদ প্রচারিত হয়। এতে বলা হয় যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন ড. ইউনূস এবং তাঁর ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন সঙ্গে সঙ্গে এই ভিত্তিহীন সংবাদের প্রতিবাদ করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রতিবাদপত্রটি উল্লিখিত দৈনিকগুলোর কোনো কোনোটি ছাপানোরই দায়িত্ব অনুভব করেনি।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আরও ভয়ংকর অপপ্রচার চলে সে সময়। নরওয়ের টেলিভিশনের একটি প্রামাণ্যচিত্রে অভিযোগ করা হয়েছিল যে গ্রামীণ ব্যাংক দাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়া ব্যাংকের তহবিল থেকে অন্য একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের তহবিলে টাকা স্থানান্তর করে অনুদানের শর্ত লঙ্ঘন করেছে। প্রামাণ্যচিত্রে কোথাও ড. ইউনূস কর্তৃক টাকা আত্মসাৎ বা দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না। অথচ এই প্রামাণ্যচিত্রের বরাত দিয়ে কিছু কিছু পত্রিকার সংবাদে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, তহবিল তছরুপ কিংবা টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়। পরে নরওয়ে সরকার নতুনভাবে তদন্ত করে জানিয়ে দেয় যে বিষয়টি বহু আগে সুন্দরভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং তাতে দুর্নীতি বা টাকা আত্মসাতের কোনো বিষয় ছিল না।
বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিষয়টি সুন্দরভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে ড. ইউনূসকে গরিবের রক্তচোষা হিসেবে ইঙ্গিত করেন এবং ক্ষুদ্রঋণের বিষয়টি ব্যাপক তদন্ত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। এরপর সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারকেরা ড. ইউনূসের সমালোচনা করেন এবং সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু সংবাদমাধ্যমে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে নানান কুৎসামূলক সংবাদ ও সংবাদভাষ্য প্রচারিত হতে থাকে। বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে যেভাবে হয়, অনেকটা তেমনভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে ভিনদেশি নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনকে যখন সরকার নানাভাবে সম্মান জানাচ্ছে, সে সময় আমাদের দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ীকে জামিনের জন্য ছুটতে দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন আদালতে।
২ মার্চ তাঁর ওপর আসে চূড়ান্ত আঘাত। সারা পৃথিবীতে সম্মানিত গ্রামীণ ব্যাংকের জন্মদাতা এবং নির্মাতাকে এদিন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে ‘অব্যাহতি’ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক একটি চিঠি দিয়ে। রাতে টেলিভিশন খুলে দেখি, আইন পেশার ধারে-কাছে নেই এমন কেউ কেউ এটি আইনগতভাবে করা হয়েছে বলে মন্তব্য করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, দারিদ্র্য বিমোচনে গ্রামীণ ব্যাংকের আদৌ কোনো সফলতা আছে নাকি তা নিয়ে। এর আগে সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানে অধিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষক ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা কর্মসূচির মাধ্যমে গরিবকে প্রতারণা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে গত বছর প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনার পর ইউনূসবিরোধী যে প্রচারণার কোরাস চলছে থেমে থেমে, তাতে দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরাও যোগ দিয়েছেন কোনো তথ্য-প্রমাণ এমনকি যুক্তি ছাড়াই।
মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকারের তদন্ত চলছে। আদালতে বিচার হচ্ছে। একই সঙ্গে একশ্রেণীর গণমাধ্যমের বিচার চলছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি নতুন প্রতিষ্ঠান, চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির উদ্ভাবন করে বাংলাদেশকে সারা বিশ্ব থেকে বিভিন্ন বিরল ও অনন্য সম্মান এনে দিয়েছেন। এমন একজন মানুষের সম্পর্কে সমালোচনার ক্ষেত্রে আমাদের দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও সংযম থাকা উচিত ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে জনগণ ও বাংলাদেশের স্বার্থ এবং দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে যথেষ্ট দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়া উচিত ছিল।

২.
মুহাম্মদ ইউনূস কি তাই বলে সমালোচনার ঊর্ধ্বে? অবশ্যই না। তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, আইনের তো নয়ই। বহু বছর ধরে ড. ইউনূসের সমালোচনা করে আসছেন বদরুদ্দীন উমর। কোন সরকার ক্ষমতায় আছে, কখন প্রধানমন্ত্রী তাঁর ওপর রুষ্ট, এই হিসাব-নিকাশ তাঁর সমালোচনায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্য বহু ব্যক্তি ও গণমাধ্যম তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড. ইউনূসের সমালোচনা করার পর। তাদের সমালোচনায় যুক্তি নেই, পাণ্ডিত্য নেই, এমনকি সৌজন্যবোধও নেই। সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং হচ্ছেন ড. ইউনূস। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে ইউনূস সেন্টার এবং মাইক্রোক্রেডিট ডিপার্টমেন্ট খুলে তাঁর চিন্তাকে অধ্যয়ন করছে, সেখানে বাংলাদেশে কিছু মানুষ কোনো প্রমাণ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রচনায় নেমেছে। আমাদের আপত্তি সেখানেই।
ব্যক্তির সমালোচনার চেয়ে মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আক্রমণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে তাঁকে অপসারণের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। পত্রিকায় দেখেছি, তাঁকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে দুটো কারণ দেখিয়ে। প্রথমত, তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, তিনি চাকরির বয়সসীমা ৬০ পার করেছেন অনেক বছর আগে। আমার মতে, এই দুটো যুক্তির কোনোটিই ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ‘গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৩’ নামে আলাদা একটি আইন অনুসারে গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালিত। এই আইনের ৩৬ ধারায় গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ব্যাংকের দক্ষ পরিচালনার স্বার্থে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ১৯৯০ সালের গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) আইনের ১৪ ধারা অনুসারে বিধিগুলো সরকার কর্তৃক পূর্বানুমোদন করানোর প্রয়োজন নেই। সে মোতাবেক ২০০১ সালের ১৯ নভেম্বর গ্রামীণ ব্যাংক একটি বিধি প্রণয়ন করে, যাতে বলা হয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চাকরির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে না এবং গ্রামীণ ব্যাংকের চাকরিবিধি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এই বিধি যদি অবৈধ না হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক বয়স বা পূর্বানুমোদনের কথা বলে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না। এই বিধি অনুসারে গ্রামীণ ব্যাংক ১০ বছর যাবৎ পরিচালিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিধিকে অবৈধ ঘোষণা না করে বা এ সম্পর্কিত কোনো আইনি উদ্যোগ না গ্রহণ করেই গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যাবতীয় কার্যক্রম চালিয়েছে। ড. ইউনূসকে আইনসংগতভাবে অপসারিত করতে চাইলে এই বিধি আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষণা করানোর বা এটি পরিচালনা পর্ষদের সভায় বাতিল করার চেষ্টা করা আবশ্যক ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক ড. ইউনূসকে অপসারিত করতে পারে কি না, তা নিয়েও আইনগত প্রশ্ন তোলা যায়। জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট অনুসারে চাকরিদাতাই কেবল চাকরি থেকে কাউকে অপসারিত করতে পারে। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ প্রদান করে ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টরস বা পরিচালনা পর্ষদ। বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল এটি অনুমোদন করতে পারে বা অনুমোদন না করতে পারে। আমাদের প্রশ্ন, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত দেয় তা ২০০১ সালের বিধির মাধ্যমে লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে মেনে নিল কেন? প্রিন্সিপল অব এসটোপেল অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ বছর পর এখন ভিন্ন ভূমিকা নিতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কাছে তার অভিমত জানানো এবং সে অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া। পরিচালনা পর্ষদ ড. ইউনূসকে সে অনুসারে অব্যাহতি না দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক আদালতে যেতে পারত। কিন্তু তাই বলে সরাসরি চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। গ্রামীণ ব্যাংক যে আইন দ্বারা পরিচালিত তাতে ঠিক এ ধরনের কোনো ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রদান করা হয়নি। ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে, কাউকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আগে তাঁকে নোটিশ দেওয়া ও তাঁর বক্তব্য শোনা। ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে এমনকি এই নীতিও মানা হয়নি।

৩.
৭০ বছর হয়েছে তাই ড. ইউনূসের চলে যাওয়া উচিত কিংবা চিরদিন এক পদ ধরে না রেখে তাঁর চলে যাওয়া উচিত—এ ধরনের কথাও বলছেন সরকারের কেউ কেউ। তাঁদের কেউ কেউ ড. ইউনূসের চেয়েও বয়স্ক বা তাঁর সমবয়সী। সরকার অবসর থেকে ডেকে এনে যাঁদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা মনে করি, বয়স নয়, জনস্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দক্ষতা ও নেতৃত্বের যোগ্যতা। ড. ইউনূস কি তাঁর দক্ষতা হারিয়েছেন, তাঁর বয়সের কারণে গ্রামীণ ব্যাংকের বিকাশ কি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে? দেশে এবং সারা বিশ্বে ব্যাংকের বিকাশ এবং ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তো দিন দিন বরং বৃদ্ধিই পাচ্ছে।
ড. ইউনূসের একটি ব্যর্থতা হচ্ছে, তিনি তাঁর উত্তরসূরি তৈরি করতে পারেননি। বাংলাদেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তোলা যায়। ড. ইউনূস এর কোনো উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হতে পারেননি। ভালো হতো, তিনি যদি তা পারতেন। ভালো হয়, সরকার ও গ্রামীণ ব্যাংক যদি অন্য কোনোভাবে ব্যাংক এবং এর সব সহযোগী প্রতিষ্ঠানে তাঁর ব্যক্তিত্ব, পাণ্ডিত্য ও অভিজ্ঞতাকে স্থায়ী ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের লক্ষ্যে কোনো আইনি সংস্কার করতে পারে। সম্মানজনকভাবে আলোচনার মাধ্যমে এখনো তা করা সম্ভব।
আমাদের বুঝতে হবে, এখন যেভাবে তাঁকে অপসারিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, এটি জনস্বার্থমূলক নয় এবং এতে সুশাসনের কোনো লক্ষণ নেই। প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে অধিকাংশ পাঠক এতে দেশের ভাবমূর্তি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন গণ্যমান্য প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও ব্যক্তিরা এর নিন্দা করছেন। উন্নয়ন-সহযোগীরা বহু আগে থেকে ড. ইউনূসকে যেভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে তাতে তাদের আপত্তির কথা জানিয়ে আসছে।
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শুধু সরকার, ড. ইউনূস বা গ্রামীণ ব্যাংক নয়। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও স্বার্থ। হুমকির মুখে পড়েছে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির সুবিধাভোগী লাখ লাখ সাধারণ মানুষ।
আমাদের উৎকণ্ঠা সেখানেই।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
তারিখ: ০৪-০৩-২০১১

দেশপ্রেমের হরতাল

গত ৩০ জুন হেঁটে যাচ্ছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে। দূর থেকে স্লোগানের শব্দ শুনে ফিরে তাকাই। দিগন্তে আলোর নাচন, দৃপ্ত মশাল উঁচিয়ে এগিয়ে আসছে মিছিল। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে মিছিলের জন্য অপেক্ষা করি, পাশে এলে তার সঙ্গে এগোই কিছুটা পথ। এই মিছিলের তরুণ-তরুণীদের চিনি আমি। এরা ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টসহ বিভিন্ন বাম সংগঠনের ছেলেমেয়ে। এরাই তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কর্মী। এদের মিছিল ক্ষমতায় যাওয়ার মিছিল নয়, উচ্ছিষ্ট ভোগের লোভ নয়, নেতা-নেত্রীর বন্দনার জন্য নয়। এই মিছিল দেশকে ভালোবাসার। এই মিছিল দেশের সম্পদ রক্ষার। একটি দেশপ্রেমিক হরতালকে সফল করার আহ্বানের।
বহুদিন পর এমন একটি হরতাল দেখলাম আমরা। এই হরতাল কি সফল হবে? সরকারের ভয়, প্রলোভন আর দাসত্ব যাদের গ্রাস করেছে, তারা হয়তো বলবে, একদম সফল হয়নি। তাতে আমাদের কিছু আসে-যায় না। এই হরতাল ডাকার মানুষ আজও আছে দেশে, এটাই স্বস্তিকর। এই হরতালে সমর্থন নেই বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টির। এই হরতাল দমনে মারমুখী হয়ে নেমেছে সরকারের পুলিশ আর গোয়েন্দা। দেশের সম্পদ রক্ষায় সোচ্চার তরুণ-তরুণীকে নির্দয় লাঠিপেটা করেছে, বন্দী করে নিয়ে গেছে পুলিশের খাঁচায়। এই হরতালে ভয় পায় সব সরকার। কারণ, কোনো না কোনোভাবে এরা সবাই বিশ্ব পুঁজিবাদের দাস। ক্ষমতার লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদ ও লুটেরা শক্তির অনুগ্রহপ্রত্যাশী। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ বিদেশিদের হাতে অসম চুক্তিতে তুলে দেওয়ার উৎকোচ এরা গ্রহণ করে নানাভাবে।
হরতাল ডাকা হয়েছে যেসব দাবিতে এবং যেসব প্রশ্ন তুলে, তার উত্তর নেই এদের কাছে। যুক্তিপূর্ণ উত্তর যেখানে নেই সেখানে থাকে মিথ্যাচার, নিন্দা আর চরিত্র হননের অপচেষ্টা। হরতাল ডেকেছে জাতীয় কমিটি। বলা হচ্ছে শুধু কমিটির সদস্য-সচিব আনু মুহাম্মদের নাম। এক নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, হরতাল ডাকার জন্য আনু মুহাম্মদ কে? আরেক অর্ধেক মন্ত্রী সংসদে তাঁকে মনু মুহাম্মদ ডেকে স্থূল ভাঁড়ামো করেছেন।
দেশ আর ইতিহাসবিস্মৃত মানুষের পক্ষে এমন আচরণ অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমরা আনু মুহাম্মদকে দেখেছি, তরুণ বয়সেই তেল-গ্যাস-অস্ত্রকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখা লিখতে। অন্য অনেকের মতো আমল বুঝে নয়, সব সরকারের আমলেই তিনি এই ষড়যন্ত্রবিরোধী লড়াইয়ে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। শুধু তিনি নন, জাতীয় কমিটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর অধিকাংশ নেতার অঙ্গীকার, দেশপ্রেম আর অবিচল পক্ষপাতশূন্যতা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের সংকটকালে জাতীয় কমিটির লোকদের কখনো দেখা যায়নি। আমার মনে হয় না, তিনি এই কমিটি সম্পর্কে খুব বেশি জেনে এটি বলেছেন। এই কমিটির আহ্বায়কসহ অনেক নেতা সেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে সব প্রগতিশীল ও জনস্বার্থমূলক আন্দোলনে শরিক থেকেছেন। নিকট অতীত থেকেই উদাহরণ দিই। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে বিবিয়ানা কূপ থেকে ভারতে গ্যাস রপ্তানি, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন এবং চট্টগ্রাম বন্দর মার্কিন কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা প্রতিরোধ করেছিল মূলত এই কমিটিই। ২০০৫ সালে এশিয়া এনার্জির কাছে কয়লা সম্পদ তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে কমিটির ডাকা হরতালে সমর্থন জানিয়েছিলেন স্বয়ং শেখ হাসিনা।
আমরা স্বীকার করি, কোনো বিষয়ে সরকারের নিজস্ব অভিমত ও বিচার-বিবেচনা থাকতে পারে। কিন্তু তাতে তো তাঁদের কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না। বহু কাটাছেঁড়া এবং তুঘলকি কর্মকাণ্ডের পরও দেশের সংবিধানে এখনো দেশের এবং এর সব সম্পদের মালিক জনগণ। সরকারের কাছে আমাদের বিনীত প্রশ্ন, জনগণের সম্পদ নিয়ে কী শর্তে কেন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হলো, তা জনগণকে কেন জানতে দেওয়া হবে না? কেন এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হবে না?
আমরা শুধু জানি, কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে পিএসসি-২০০৮-এর অধীনে। জাতীয় কমিটি এর কয়েকটি অনুচ্ছেদকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলছে এবং কিছু প্রশ্ন তুলেছে। যেমন—কেন কনোকোফিলিপসের প্রাথমিক বিনিয়োগের চেয়ে তিন গুণ বেশি অর্থ ব্যয়ে ১৭৫ মাইল পাইপলাইন স্থাপন করলেই কেবল বাংলাদেশ প্রাপ্ত গ্যাসের মাত্র ২০ শতাংশের অধিকারী হবে? ‘দুর্ঘটনার রাজা’ হিসেবে পরিচিত কনোকোফিলিপসের কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে বঙ্গোপসাগর, তার সম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার কী নিশ্চয়তা চুক্তিতে রয়েছে? এই চুক্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের সীমানা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের দাবি কি একপক্ষীয়ভাবে মেনে নেওয়া হলো? জাতীয় কমিটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পুঁজি সংগ্রহ করে এবং প্রয়োজনীয় সাব-কনট্রাকটিং করে তেল-গ্যাস উত্তোলনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আমরা নিজেরাই কেন গ্রহণ করি না?
জাতীয় কমিটির নিজস্ব বক্তব্য আছে এসব প্রশ্নের। তাদের সব বক্তব্য-বিশ্লেষণ অকাট্য না-ও হতে পারে। তাদের বক্তব্যে এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তবতার কমতিও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের নির্দিষ্ট বক্তব্যের কোনো উত্তর নেই কেন সরকারের? কেন তারা প্রকাশ করছে না কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি বা ভারত-আমেরিকাসহ অন্য রাষ্ট্র বা বিদেশি কোম্পানিদের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি? কেন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে সংসদে পেশ করা হয় না এসব চুক্তি?
আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেউ এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে না। তাদের অশুভ অলিখিত আঁতাত এখানেই। এই আঁতাতে আমরা অন্যান্য দলের বর্ণচোরাদেরও মাঝেমধ্যে কৌশলে অংশ নিতে দেখি। এত অন্ধকারে তাই দেশপ্রেমী বামদের মশাল মিছিল অক্ষয় আলো হয়ে থাকে। তাদের হরতালই প্রকৃত দেশপ্রেম।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একটাই প্রার্থনা এখন

পাঁচ-ছয় বছর আগের কথা। বাংলাদেশ দলে এসেছেন নতুন এক মারকুটে ব্যাটসম্যান। দলের প্রথম ব্যাটসম্যান প্রায়ই আউট হয়ে ফিরে আসেন শ খানেক রানের মধ্যে। তারপর নামেন অলক কাপালি নামের এক উদ্ধত যুবক। কখনো খালেদ মাসুদ, কখনো রফিককে নিয়ে অবলীলায় মারতে থাকেন বাঘা বাঘা বোলারকে। রক্তে নাচন শুরু হয়। উত্তেজনায় শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে ওঠে। উল্লাসে কত অর্থহীন কথা বলে উঠি! একবার তাঁর ছয় মারা দেখে চিৎ কার করে বলি, ‘সব সম্পত্তি দিয়ে দেব তোমাকে!’ আমার মেয়ে রিমঝিম সকৌতুকে বলে, ‘আব্বু, তোমার তো কোনো সম্পত্তিই নেই!’ অতি সত্যি কথা। কিন্তু তবু আমি বিরক্ত হই, বের করে দিই তাকে টেলিভিশনের সামনে থেকে। আমার মেয়ে একটু পরে উঁকি দিয়ে বলে, ‘আব্বু, আলাকাপালা আউট নাকি!’ আমাকে খেপানোর জন্য সে অলক কাপালির নাম অশুদ্ধভাবে বলে। কিছুক্ষণ পর খেলা শেষ হয়। অলক-পাইলটদের বীরত্ব শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ আবারও হেরেছে। অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসে থাকি আমি। আমার মেয়ের মায়া হয় বোধহয়; কাঁচা ভঙ্গিতে বোঝানো শুরু করে, হেরেছে তো কী হয়েছে! দেখো, একদিন জিতবে।
সেই একদিন আসে এক-দুই বছর পরপর। আল-শাহরিয়ার, হান্নান শাহ, রাজিন সালেহ, মুশফিকুর রহমান, ফরহাদ রেজা, তাপস বৈশ্য—কত সম্ভাবনা নিয়ে আসেন এক-একজন। বারুদের মতো কিছুদিন জ্বলে উঠেই সব শেষ। আশরাফুলের বারুদের উত্তাপ বেশি, কিন্তু সেও অনিয়মিত। হাবিবুল বাশার, পাইলট, রফিক চেষ্টা করেন যথাসাধ্য। কিন্তু তা সম্মানজনক পরাজয়ের চেষ্টা, বিজয়ী হওয়ার উদ্ধত সাহস পুরোপুরি নেই তাঁদের। ম্যাচের পর ম্যাচ হারে বাংলাদেশ। লাঞ্ছিত, অপমানিত, ছিন্নভিন্ন হয়ে বসে থাকি খেলা শেষে। আমি, আমার চেনাজানা আরও কত মানুষ! সে কি ক্রিকেটের জন্য? না, সে আমার প্রিয় মাতৃভূমির জন্য। তার পরাজয়ের বেদনায়।
বুকের ভেতর থাকে কত রকম দীর্ঘশ্বাস! অলিম্পিকে কতবার জিতে যায় ছোটখাটো ভুখা-নাঙা মানুষের দেশ! পদক নেওয়ার সময় তাদের পতাকা ওঠে, জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে। কেনিয়া, ইথিওপিয়া, জ্যামাইকার সোনাজয়ী মানুষের চোখে পানি আসে। আসে আমাদের চোখেও। আহা রে! কবে জিতবে বাংলাদেশ! কবে সব পতাকা ছাপিয়ে উঠবে বাংলাদেশের পতাকা! অলিম্পিকে আশা নেই, বিশ্বকাপ ফুটবলে আশা নেই, টেনিস-বাস্কেটবল-গলফ—কোথাও নেই বাংলাদেশ। রাজনীতি আর অর্থনীতি দূরের কথা, খেলায়ও নেই বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশ থাকতে পারে কেবল ক্রিকেটেই। যদি কিছু হয়, ক্রিকেটেই হবে। নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকে বাংলাদেশের মানুষ। পরাজয়ের পর পরাজয়ে নীল হয় হূদয়, তবু ফিরে আসে তারা বারবার। স্টেডিয়ামে না পারলে টিভি বা রেডিওর সামনে।
সেই দিন এসেছে বাংলাদেশের। বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর অমিত প্রতিভা, দুঃসাহস আর দৃঢ়চিত্ত নিয়ে এসেছেন আমাদের সাকিব, আমাদের তামিম। টানা দুই বছর ধরে কে বিশ্বের সেরা ওয়ান-ডে অলরাউন্ডার? আমাদের সাকিব। কে উইজডেনের বর্ষসেরা ব্যাটসম্যান? আমাদের তামিম। আমাদের রাজ্জাক আর শফিউল এখন পারেন যেকোনো ব্যাটসম্যানের উইকেট গুঁড়িয়ে দিতে। সাকিব-তামিমের অবিশ্বাস্য উজ্জীবনী ক্ষমতায় গত দুই বছরে একের পর এক বিশ্বসেরা দলকে নাস্তানাবুদ করেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া হোক, ভারত হোক, বাংলাদেশ এখন আর সম্মানজনক পরাজয়ের আশায় খেলে না। খেলে বিজয়ের প্রত্যয় নিয়ে।
বাংলাদেশ কি জিতবে এবার বিশ্বকাপ? না জিতুক, বিশ্বসেরা দু-তিনটি দলকে তো হারাতে পারি আমরা। এই বিশ্বাস অন্তত অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আমার কেবলই মনে হয়, এই বিশ্বাস যদি থাকত সব ক্ষেত্রে! সুশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি, অবকাঠামো, আবিষ্কার, অর্জন—সবকিছুতে যদি থাকত এই বিশ্বাস! যদি থাকত বিশ্বসেরাদের কাতারে ওঠার সম্ভাবনা!
সারা বিশ্বে বাংলাদেশের নামও যদি উচ্চারিত হতো শ্রদ্ধা আর সম্মানের সঙ্গে!

২.
আমাদের দেশ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই অন্য কারও। নিজের দেশটা সম্পর্কে বাইরের পৃথিবীর ধারণা ভালোভাবে বোঝা যায় সেসব দেশে গেলে। আমাদের জন্য সে অভিজ্ঞতা সুখের হয় না অনেক সময়। ১৯৯৪ সালে লন্ডনে পড়তে গিয়ে লন্ডন হাউসে থাকার সুযোগ হলো আমার। অন্য দেশের ছাত্ররা এসে জানতে চায় কোন দেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশ শুনে চুপ করে থাকে তারা। আমি আগ্রহ নিয়ে বলি, নাম শুনেছ বাংলাদেশের? হ্যাঁ, শুনেছে তারা। বাংলাদেশ পানিতে ডুবে থাকা দেশ আর তসলিমা নাসরিনকে বের করে দেওয়া দেশ! আমি প্রায় হাহাকার করে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি, অনেক অর্জন আছে আমাদের।
একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা শুনেই কিছুটা সম্ভ্রম জাগে তাদের। বাইরের বিশ্বে তাক লাগানো অন্য কোনো অর্জন নেই আমাদের। গরিব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর রাজনৈতিক হানাহানির দেশ আমাদের। এই পরিচয় মুছে দেওয়ার শক্তি ছিল না তখন কারও।
সময় এগোয়। বাংলাদেশের ছবি উজ্জ্বল করতে পারি না আমরা। অন্য দেশের এয়ারপোর্টে আমাদের পাসপোর্ট নিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসারদের উল্টেপাল্টে দেখা শেষ হয় না। পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে চেহারা মিলিয়ে দেখা, শূন্যে উঁচু করে ধরে পাসপোর্ট ঠিক নাকি দেখা, কম্পিউটারে অনবরত টিপাটিপি করে কী সব পরীক্ষা করে দেখা—তাদের সন্দেহ যেন কাটে না কিছুতেই। পেছনে বিরক্ত মানুষের লাইন, সামনের ডেস্কে সন্দিহান অফিসার। তাঁর সন্দেহ না কাটলে আরেক ডেস্কে পাঠানো। সবাই বের হয়ে যায়, শুধু আটকে থাকি আমরা আর আফ্রিকার কালো কিছু মানুষ। কত দিন আমার ইচ্ছে হয়, পালিয়ে যাই এই অপমান থেকে। কত দিন মনে হয়, পিএইচডি করতে গিয়ে অন্য কোনো শিক্ষকদের মতো চেষ্টা করলাম না কেন ব্রিটেনের পাসপোর্ট পাওয়ার। একসময় সবুজ ময়লা পাসপোর্ট ফেরত আসে হাতে। বুকের ভেতর হু-হু করে ওঠে, এই পাসপোর্ট আমার মাতৃভূমির। শত অপমানে কোনো দিন কখনো ত্যাগ করব না তাকে।
কিন্তু আমাদেরও ইচ্ছে হয় পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে। এই কাজ বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান করেছে। ড. ইউনূস নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাংলাদেশকে একটি ক্ষেত্রে হলেও সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়েছেন। তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক আর ড. আবেদের ব্র্যাক সারা বিশ্বে অনুকরণীয় উন্নয়নের মডেল হয়েছে। দুই নেত্রী এরশাদের সামরিক জান্তাকে রুখে দিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে সারা বিশ্বের সম্ভ্রম অর্জন করেছিলেন। আমাদের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার কাজ করে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। টুকরো টুকরো এসব সাফল্যে গোটা দেশ যত দূর এগিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়েছে আমাদের প্রতিবেশী বা আমাদের সঙ্গে একসময়ের তুলনীয় দেশগুলো। বেদনার বিষয় হলো, আমরা আমাদের সাফল্য সংহত করতে পারিনি। নিজেরা নিজেরা হানাহানি করে, একে অন্যের সর্বাত্মক চরিত্র হনন করে, দেশের ঊর্ধ্বে দল বা ব্যক্তিকে স্থান দিয়ে, নিজের দেশ সম্পর্কে অপপ্রচারে নানাভাবে নিজেরাই অংশ নিয়ে সাফল্যের টুকরো টুকরো ক্যানভাসকে কালিমালিপ্ত করার আত্মবিনাশী কাজ আমরা করেছি। বাংলাদেশের পজিটিভ ব্র্যান্ডিং দূরের কথা, বাংলাদেশকে অপমানিত করার খবর আমরাই জন্ম দিয়েছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক ভাষা, এক সংস্কৃতি, এক জনগোষ্ঠীর দেশে নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থে কৃত্রিমভাবে হুটু-টুটসির মতো বিবদমান বিভাজন তৈরি করেছেন আমাদেরই সর্বোচ্চ নেতারা।
আমাদের দিন ফেরেনি। বাংলাদেশ তার প্রকৃত শক্তি আর সম্মান নিয়ে বিশ্বে দাঁড়াতে পারেনি। হালকা কথা মনে হতে পারে কারও কাছে, তবু বলি, একমাত্র ক্রিকেটেই মনে হয় নিজেদের প্রকৃত শক্তি অনেকটা দেখাতে পেরেছি আমরা। ক্রিকেটে অন্তত আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিভাজন নেই; দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা আর সন্ত্রাসের কালিমা নেই। ক্রিকেটেই শুধু দুই নেত্রীর প্রতি কোনো হুমকি নেই। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে শুধু নোবেল বিজয় আর ক্রিকেট সাফল্যেই ইতিবাচক শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশ।
নোবেল বিজয়ীর চরিত্র হননে নেমেছে এখন নানা মহল। ঢালাও অভিযোগ আনা হচ্ছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হচ্ছে তাঁকে। ব্যর্থতার দায়ে যাঁর পদত্যাগের দাবি উঠেছে নানা মহলে এমন একজন মন্ত্রী নোবেল বিজয়ীকেই বলছেন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করতে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সমালোচিত হচ্ছেন নোবেল বিজয়ী নন, তাঁর প্রতিপক্ষরা, এক অর্থে গোটা বাংলাদেশ।
তবু ভালো, ক্রিকেটকে অন্তত কালিমালিপ্ত করিনি আমরা। শেয়ারবাজার, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ আর রাজনৈতিক সংঘাতে বিপর্যস্ত মানুষ কিছুদিন অন্তত দুঃখ ভুলে থাকতে পারে ক্রিকেটের মধ্যে; সাকিব বাহিনীর সাফল্যে নির্ভেজাল আনন্দে উদ্বেল হতে।

৩.
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের তাই অভিনন্দন। মায়ের মতো স্নেহকণ্ঠে ক্রিকেটারদের সাফল্য চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী; তাঁকে অভিনন্দন। বিরোধী দলের নেত্রী বিশ্বকাপে কর্মসূচি দেবেন না; তাঁকেও অভিনন্দন। কয়েক সপ্তাহ থাকি না আমরা সব বিভেদ ভুলে! থাকি আমাদের ছেলেদের সাফল্য কামনায়, অসামান্য একটি আয়োজন সফল করার চেষ্টায়। কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশ হোক না গৌরবদীপ্ত শিরোনাম!
আমি কল্পনায় দেখি, বাংলাদেশ খেলছে। সারা দেশের মানুষ দুই হাত তুলে, দুই হাত জোড় করে প্রার্থনা করছে। সারা দেশের একটাই প্রার্থনা, বাংলাদেশের বিজয়। ক্রিকেটের আনন্দাশ্রু, দীর্ঘশ্বাস, উল্লাসে যে নিখাঁদ ঐক্য আমাদের, তা-ই আমাদের দেশপ্রেম। তা-ই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
আমি বিশ্বাস করি, একদিন এই ঐক্যের ভূমি থেকেই জন্ম নেবেন আমাদের কোনো নেতা, আমাদের প্রকৃত অগ্রনায়ক।
আসিফ নজরুল: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক।

স্বাধীন দেশ, পরাধীন মন

বাঙালি মধ্যবিত্তের পরাধীন মন নিয়ে অনেক কথা হতো একসময়। এ নিয়ে লিখেছেন দুই বাংলার নামী কয়েকজন লেখক। এখন অবস্থা বদলেছে কিছু ক্ষেত্রে। এই বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশ পেয়েছে। মধ্যবিত্তের আকার বেড়েছে বহু গুণ, কেউ কেউ নানা উপায়ে বিপুল সম্পদের মালিকও হয়েছে। এখন পরাধীনতা থাকার কথা নয় আমাদের। কিন্তু এখনো বাঙালি মধ্যবিত্তের সবচেয়ে সুবিধাভোগী অংশের মধ্যে রয়েছে ঔপনিবেশিকতার ভূত, মানসিক পরাধীনতার শৃঙ্খল। মাঝেমধ্যে তা এতই প্রবল যে মন খারাপ করে বসে থাকতে হয় অনেকক্ষণ।
পরাধীন মানুষের দেশপ্রেম কম থাকে। আত্মসম্মানবোধ সম্ভবত আরও কম। অথচ সরকারে হোক সরকারের বাইরে হোক, পরাধীন মানুষেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। দেশে এদের দম্ভ আর দাপটের শেষ নেই। কিন্তু সব দাপট, সব আত্মসম্মান ম্লান হয়ে যায় অন্য জায়গায়। উপসচিব বা যুগ্ম সচিব মর্যাদার বিদেশি দূতের কাছে এরা নতজানু হয়ে থাকে, বিদেশে সামান্য খাতির পেলে এরা ধন্য হয়ে যায়, নিম্নশ্রেণীর বিদেশি পরামর্শকদের এরাই মাথায় তোলে। বিদেশের টাকায় নিজের দেশের দোষত্রুটি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সারা বিশ্বে এরাই প্রচার করে। বিনিময়ে পুরস্কৃত হয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে। ডুবিয়ে দেয় দেশকে।
পরাধীন মানুষ নিজ দেশের মানুষের স্বার্থ নিরাপদ করতে পারে না। পারে না দেশের সম্পদ রক্ষা করতে। দেশের গ্যাস বিদেশিদের কাছে রপ্তানি করার সার্টিফিকেট এরাই দিয়েছিল। প্রকৌশলী শহীদুল্লাহ্ আর আনু মুহাম্মদের মতো দেশপ্রেমিক মানুষ না থাকলে, তাঁদের আন্দোলন না থাকলে এরা তখনই সফল হতো। পরাধীন মানুষ দেশের পানিসম্পদ উজাড় করার ভারতীয় প্রকল্পে সমর্থন দেয়। বিদেশিদের বক্তব্য স্বদেশি কণ্ঠে প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালায়। পরাধীন মানুষ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছে বেহাত হওয়া হাজার কোটি টাকার সম্পদ ফেরত চাইতে ভুলে যায়, গণহত্যার জন্য ক্ষমা দাবি করার গুরুদায়িত্ব বিস্মৃত হয়। পরাধীন মানুষ ১৯৭৫ সালের নির্মম হত্যাকাণ্ডে অন্য সবার ভূমিকার কথা বলে, বলতে ভুলে যায় বিদেশি যড়যন্ত্রের কথা।
পরাধীন মানুষ স্বাধীনতার চেতনার কথা বলে। কিন্তু ব্যর্থ হয় নিজেকে স্বাধীন করতেই। দেশপ্রেমের কথা বলে। কিন্তু ব্যর্থ হয় দেশপ্রেমের মানে বুঝতে, নিজের দেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে।

২.
পরাধীন মানুষ সবচেয়ে নির্মম ব্যর্থতা দেখায় দেশের মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে। এমনই এদের পরাধীন মন, দেশের সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে পারে না এরা সজোরে। সীমান্তে দেশের মানুষ খুন হলে এরা বড়জোর দুঃখিত হয়। ইসরায়েল-পশ্চিম তীর সীমান্তে এখন খুন হলে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে মানুষ। আমেরিকা-মেক্সিকোতে তা হলে আমেরিকাতেই ওঠে প্রতিবাদের ঢেউ। খুন হওয়া দেশের সরকার প্রতিবাদ করে, ক্ষোভ জানায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রতিকার চায়। আমাদের পরাধীন কর্তারা অধিকাংশ সময় নির্বিকার থাকে, মাঝেমধ্যে কেবল দুঃখিত হয়। ছোট দেশ, কর্তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা হয়তো রয়েছে। কিন্তু নাগরিক সমাজ! তার বৃহত্তর অংশও চেপে যেতে চায় এই বৈরিতা, পারলে সেদিনও অপ্রাসঙ্গিকভাবে স্মৃতিচারণা করে বন্ধুত্বের।
বিএসএফ বা ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত হচ্ছে সীমান্তের গ্রামগুলোর দরিদ্র ভারতীয় নাগরিকেরাও। এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ, সংযোগ, এসডিটিসি, এসপিএমইউএম, বিএপিইউয়ের মতো অনেক ভারতীয় মানবাধিকার সংস্থা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানবাধিকার সংগঠনের ভ্রুক্ষেপ নেই এই মানবতাবিরোধী অপরাধের দিকে। কেউ কেউ হত্যাকাণ্ডের তালিকা করে পাঠায় সংবাদপত্রে। কোনো কোনো পত্রিকার ইচ্ছেই হয় না এই সংবাদ ছাপার!
সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ডের ওপর প্রামাণ্য রিপোর্ট করেছিলেন লন্ডনভিত্তিক চ্যানেল ফোরের জোনাথন রাগম্যান। এই রিপোর্ট করেন তিনি ২০০৯ সালের আগস্টে। পরম বন্ধু দুই সরকার তখন দুই দেশে। অথচ এরই মধ্যে আধা বছরে খুন হয়েছে ৬০ জনের বেশি বাংলাদেশি। রাগম্যানের বর্ণনা: ‘যে তিনটি গ্রামে আমরা গিয়েছি, স্থানীয় লোকেরা ভিড় জমিয়েছে তাদের মৃত স্বজনদের ছবি নিয়ে। ক্যামেরার সামনে বারবার বলতে চেয়েছে, কতজন কৃষক আর রাখাল মারা গেছে বিএসএফের গুলিতে।’
রাগম্যান ভারতীয় কাঁটাতারের বেড়ার ছবি তুলেছেন, বিএসএফ গার্ড পোস্টের উঁচু করা বন্দুক দেখিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাদের সাংবাদিকদের কাছেই ভিড়তে দেওয়া হবে না এসব রিপোর্ট করতে। কিন্তু আমাদের কলামিস্ট আছেন, আলোচক আছেন, টক শো আছে, সেখানে এর প্রতিবাদ হয় কালেভদ্রে। এমনকি সেখানেও বিস্ময়করভাবে বলে ওঠেন কেউ কেউ: অবৈধভাবে বাংলাদেশের মানুষ সীমান্ত পার হয় বলেই নাকি বিএসএফ গুলি করে!
অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে গেলে আর কোনো দেশের সীমান্তরক্ষীরা গুলি করে বিনা নোটিশে? ইসরায়েল-পশ্চিম তীর বাদে আর কোনো সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয় এত মানুষ? কোন দেশ বছরের পর বছর বিনা কিংবা ভুয়া প্রতিবাদে মেনে নেয় এমন করুণ মৃত্যু?
ভারত-পাকিস্তান নাকি ‘শত্রু’ দেশ। সেখানে বিএসএফ সীমান্ত পার হয়ে যাওয়া পাকিস্তানিদের গ্রেপ্তার করে, গুলি করে না। এই মাত্র দুই দিন আগে বিএসএফের ক্রোকোডাইল ইউনিট ভারতের জলসীমা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পাকিস্তানি ছয় জেলেকে। গোলাগুলির ঘটনা সেখানেও ঘটে কখনো কখনো। কিন্তু পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে অধিকাংশ সময় ঘটে গ্রেপ্তারের ঘটনা। আমরা কখনো গ্রেপ্তারের খবর পাই না, সতর্ক করে দেওয়ার জন্য ফাঁকা গুলির খবর পাই না, পাই শুধু বুকে কিংবা মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর। খুন হয় মাঠে গরু চরাতে যাওয়া যুবক, বাবার আহার নিয়ে যাওয়া কিশোরী, ফসল দেখে ফিরে আসার পথে বৃদ্ধ। খুন হয় বৈরী সরকারের আমলের মানুষ, বন্ধু সরকারের আমলের মানুষ।
খুন হওয়া এই মানুষেরাও ছিল এ দেশের মানুষ। নির্বাচনে নিশ্চয়ই এরাও ভোট দিয়েছিল আওয়ামী লীগ আর বিএনপিকে। মহাশক্তিধর এই দুই দল ব্যস্ত থাকে পরস্পরকে ধ্বংস করার কাজে। সীমান্তে মানুষ খুন হলে বিএনপি ফাঁকা প্রতিবাদ করে। আওয়ামী লীগ কাকুতি-মিনতি করে। ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের গুলিতে মরতেই থাকে বাংলাদেশের মানুষ।
সারা পৃথিবীতে এমন বন্ধুত্বের নজির অন্য কোথাও আছে কি? আছে নজির বাংলাদেশের মতো এমন নতজানু পররাষ্ট্রনীতির?

৩.
সীমান্তে মানুষ মরলে বা সম্পদ বেহাত হলে আমরা কী করব? ভারত, আমেরিকা বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করব? সেটি সম্ভব নয়, সংগতও নয়। কিন্তু সম্ভব জাতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের। সম্ভব সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে নিন্দা জানানোর, প্রতিকার দাবির। যৌথ নদীতে অন্য দেশ একতরফা বাঁধ দিলে, সমুদ্রসীমায় হানা দিলে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাগড়া দিলে আমরা কেন পারি না ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ জানাতে? জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি হলে আমাদের সংসদে কেন ওঠে না প্রতিবাদের ঢেউ? জাতীয় স্বার্থ বিপন্ন হলে আমাদের নাগরিক সমাজ কেন পারে না ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে?
অথচ আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা ছিল। আমাদের অধিকাংশ মানুষের জাতি, ভাষা ও ধর্ম এক। সংখ্যালঘু মানুষেরও নেই কোনো অসংগত দাবি। আমরাই একসঙ্গে ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন আর স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছি। এমন বর্ণাঢ্য ইতিহাস নেই ভারত, পাকিস্তান বা পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেরই। তবু আমরা বিভক্ত এমনকি জাতীয় স্বার্থমূলক বিষয়েও।
শুধু কি সংকীর্ণ স্বার্থ বা নেতা-পূজাই রাখে আমাদের বিভক্ত করে? আমার তা মনে হয় না। এর আরেকটি কারণ আমাদের মানসিক পরাধীনতাও। আমাদের সমাজের সুবিধাভোগী মানুষের একটি বিরাট অংশকে বলা হয় ভারতের ‘দালাল’, আরেকটি বিরাট অংশকে পাকিস্তানের ‘দালাল’। এটা ঢালাও অভিযোগ, কিন্তু সকল ক্ষেত্রে ভিত্তিহীন নয়। প্রকাশ্যেই আমরা বহু হর্তাকর্তাকে দেখি নিজের দেশের কথা না বলে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থে কথা বলতে।
বন্ধুত্ব মানে মানসিক দাসত্ব নয়। বন্ধুত্ব মানে বিনা প্রতিবাদে কোনো অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। বন্ধুত্ব মানে একসময়ের উপকারের কথা স্বরণ করে পরবর্তী সময়ের সকল সর্বনাশ মেনে নেওয়া নয়। আমরা অনেকেই জানি না তা। নাকি জানতে চাই না?
আমাদের পরাধীন মানসিকতা আর বিভক্তির কথা জানে প্রতিবেশী দেশ, দূরের সব দেশ। বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত করা সম্ভব হয় এ কারণেই।
আমাদের এই দীনতা ঘুচবে কবে?

৪.
আমার আরও কিছু বলার ছিল। সকালে উঠে প্রথম আলো পড়ে আর কিছু লেখার শক্তি হারিয়ে যায়। প্রথম আলো শেষ পাতায় ছাপিয়েছে দুই বছর নয় মাস বয়সী শিশু ধর্ষিত হওয়ার সংবাদ। মুখ চেপে এই অবোধ শিশুকে ধর্ষণ করেছে কেউ। কোনো মানুষ দেখলেই আঁতকে ওঠে এখন সে। এই লজ্জা কোথায় রাখি আমরা!
এই শিশুকে ক্ষতবিক্ষত করেছে মানুষ নামধারী এক পশু। কিংবা পশুর চেয়ে বর্বর কেউ। উন্মত্ত পশুও ধর্ষণ করে না তাদের গোত্রের বা অন্য কোনো শিশুকে। আমাদের সমাজের একজন করেছে। এই ‘মানুষ’কে খুঁজে বের করতে পারবে না পুলিশ? তাকে জামিন না দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবেন না কোনো আদালত?
যদি না পারে, তাহলে সেই পশুর কাছে ধর্ষিত আসলে আমরা সবাই!
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।